আমাদের দেশে রিটার্ন দাখিল করাকে অনেকে ঝক্কির বিষয় বলে মনে করেন। আমাদের মাঝে অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা এই যে, রিটার্ন দাখিল করলেই ট্যাক্স অফিসের নজরে পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে, রিটার্ন দাখিল না করলেই বরঞ্চ ট্যাক্স অফিসের নজরে পড়বে। তাই, করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক টিন নিলেই রিটার্ন দাখিল করাই শ্রেয়। পাশাপাশি যদি একটু কৌশলী হওয়া যায় তাহলে তো কথাই নেই, উল্টো আরও কর ছাড়ও পাওয়া যাবে। নিম্নে রিটার্ন দাখিল করার ১০টি নিঞ্জা টেকনিক নিয়ে আলোচনা করা হলঃ
🔹নিঞ্জা টেকনিক-১- পুরুষদের ৩লাখ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে ৩লাখ ৫০হাজার পর্যন্ত আয় হলে কোন কর দিতে হবে না। সুতরাং যারা করমুক্ত সীমার নিচে আয় করেছেন তারা নির্ভয়ে রিটার্ন জমা দিন। কিন্তু যাদের বেতন করমুক্ত সীমা অতিক্রম করেছে, খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, তাদের প্রত্যেকেরই বেতন দেয়ার সময় অফিস থেকে ট্যাক্স কেটে রাখে এবং তারা যদি সরকার নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করার ফলে তারা যে রিবেট(কর ছাড়) পাবে এরপর আর কোন আর ট্যাক্স দিতে হচ্ছে না, শুধু রিটার্ন দাখিল করলেই যথেষ্ট।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-২- বাড়ীওয়ালারা যারা মাসিক ২৫ হাজার টাকার বেশী ভাড়া পেয়ে থাকেন তারা যদি বাড়ী ভাড়ার জন্য আলাদা ব্যাংক একাউন্ট পরিচালনা করে এবং বাড়ী ভাড়ার রশিদ,চুক্তি পত্র ও খাতা পত্র সংরক্ষণ করে সেক্ষেত্রে, তাদের আয়করের ক্ষেত্রে, আবাসিক হলে ভাড়ার ২৫% মেরামত বাবদ বাদ দিতে সুবিধা হবে এবং কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হবে না। বাড়ির উপর হোম লোন নিয়ে থাকলে লোনের কাগজপত্র নিশ্চিন্তে জমা দিন, লোনের উপর কোন ট্যাক্স দিতে হয় না উল্টো আরও লোনের সুদ বাড়ী ভাড়ার আয় থেকে বাদ দেয়া যায়। পাশাপাশি সময়মত পৌড়কর পরিশোধ করুন যা বাড়ী ভাড়ার আয় থেকে বাদ দিতে পারবেন এবং ট্যাক্স এর ক্ষেত্রে সুবিধা নিতে পারবেন।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৩- যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছেন তারা যদি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করে অর্থাৎ তাদের ব্যবসার নামে আলাদা ব্যাংক একাউন্ট থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে রিটার্ন করার ক্ষেত্রে ব্যাংক একাউন্টকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। এক মালিকানা ব্যবসার ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি Income Statement ও Balance Sheet তৈরি করে দিতে হবে।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৪- যারা পেশাজীবী তারা খাতাপত্র সংরক্ষণ করলে তাদের জন্য ট্যাক্স দিতে সুবিধা হয়। যেমন ধরুন, ডাক্তারের আয়ের ক্ষেত্রে, একজন ডাক্তার কতজন নতুন রোগী দেখেছেন ও কতজন পুরাতন রোগী দেখেছেন এবং কত টাকা ফি নিয়েছেন তার একটি হিসাব রাখলে ট্যাক্স দিতে সুবিধা হয় তাছাড়াও পরবর্তীতে আয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করলে আয়ের প্রমাণস্বরূপ নথিপত্র দাখিলের সুযোগ থাকে।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৫- সঞ্চয়পত্রের সুদের ট্যাক্স আলাদা গননা করতে হবে। এই সুদের উপর পুনরায় কোন ট্যাক্স দিতে হয় না। যেমন ধরুন, রহিম এর বেতন থেকে আয় ২লাখ ৯০হাজার টাকা এবং সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে আয় ১লাখ টাকা। তথাপি, রহিমের মোট আয় ৩লাখ টাকার উপরে কিন্তু তাকে আর পুনরায় ট্যাক্স দিতে হবে না। কারণ, রহিমের নিয়মিত আয় ৩লাখ টাকার নিচে এবং সঞ্চয়পত্রের সুদের আয় থেকে ট্যাক্স কেটে রাখা হয়েছে, যা চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য। কিন্তু, রহিমকে ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৬- পার্টনারশিপ ফার্মের ক্ষেত্রে আলাদা রিটার্ন দাখিল করতে হয় এবং মজার বিষয় হচ্ছে, পার্টনারশিপ ফার্মের যে ট্যাক্স আমরা পরিশোধ করব তা ব্যক্তিগত রিটার্নে রিবেট(কর ছাড়) নেয়া যায়। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি তুলে ধরা হল। যেমন ধরুন, রহিম ও করিম দুই বন্ধু মিলে একটি পার্টনারশিপ ব্যবসা চালু করল (রহিমের ও করিমে প্রত্যেকের শেয়ার ৫০ শতাংশ করে) এবং পার্টনারশিপ ব্যবসা থেকে আয়ের উপর ট্যাক্স পরিশোধিত হওয়ার কারণে সেই টাকা ব্যক্তিগত ট্যাক্স ফাইলে অন্যান্য আয়ের সাথে সমন্বয় করে রিবেট(কর ছাড়) নিতে পারবে। সেক্ষেত্রে, রহিম ও করিমের ব্যক্তিগত ট্যাক্স ফাইল দাখিল করার পূর্বে পার্টনারশিপ ফার্মের ট্যাক্স রিটার্ন আগে দাখিল করতে হবে, অর্থাৎ মোট ৩টি ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৭-কোন সম্পত্তি(জমি বা ফ্ল্যাট) হস্তান্তর করে মুনাফা হলে তা রিটার্নে মূলধনী আয় হিসেবে দেখাতে হবে। জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করে আয় হলে উক্ত আয় মূলধনী আয় হিসেবে গণ্য হবে। আমাদের মধ্যে অনেক করদাতা আছেন যারা ব্যক্তি পর্যায়ে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করে আয় গোপন রাখে। ধারণা করেন যে, জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির আয় রিটার্নে প্রদর্শন করলে আলাদা ট্যাক্স দিতে হবে। এটি একটি ভুল ধারণা। জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করার সময় রেজিস্ট্রি অফিস ট্যাক্স কেটে রেখে দেয়। এর পর আর কোন ট্যাক্স দিতে হয় না। এই ট্যাক্স চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য হবে।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৮-অন্যান্য সূত্রের আয় যেমনঃ FDR এর সুদ প্রাপ্ত হলে রিটার্নে দেখানো উচিৎ। কেননা, ব্যাংক থেকে মুনাফা দেয়ার সময় ট্যাক্স কেটে রাখা হয়। যেমন ধরুন, রহিম এর একমাত্র আয়ের উৎস FDR এর মুনাফা বাবদ ২লাখ ৮০হাজার টাকা পেয়েছে যা করযোগ্য আয় সীমার নিচে এবং ব্যাংক এই ২লাখ ৮০হাজার টাকা থেকে ২৮ হাজার টাকা ট্যাক্স হিসেবে কেটে রাখেছে, সেক্ষেত্রে রহিম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করলে তাকে ট্যাক্স দিতে হবে না এমনকি পরের বছরগুলোতে ২৮হাজার টাকা প্রত্যার্পণ বা স্বমন্বয় করতে পারবেন।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-৯- ট্যাক্স রিটার্নে শুধুমাত্র ট্যাক্সের হিসাবই নয়, আয়-ব্যয়, সম্পত্তি-ঋণ, দান ইত্যাদি সবকিছুর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। তাই, সকল বৈধ সম্পত্তি ট্যাক্স রিটার্নে উল্লেখ করলে করদাতার জন্যই সুবিধা। প্রয়োজনে রিটার্ন জমা দেয়ার পূর্বে একটি চেকলিস্ট তৈরি করে নিন।
🔹নিঞ্জা টেকনিক-১০- পড়ুন, পড়ুন এবং পড়ুন। ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করাকে অনেকে হালকা ভাবে নেয়। কিন্তু, আমাদের মতে, ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করার সময় একবার নয়, বেশ কয়েকবার আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪, আয়কর রিটার্ন, আয়কর পরিপত্র ইত্যাদি বইগুলো ভালোভাবে পড়া উচিৎ। তথ্য সমৃদ্ধ না হয়ে আয়কর রিটার্ন পূরণ না করাই শ্রেয়।
পরিশেষে বলতে হয়, যদিও ৩০ নভেম্বর আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার শেষ সময়, তথাপি, শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে আগভাগেই রিটার্ন তৈরি করে জমা দিন।
অমিত নন্দী
আয়কর আইনজীবী